Hathazari Sangbad
হাটহাজারীসোমবার , ৯ অক্টোবর ২০২৩

ইসরায়েলকে যেভাবে ধোঁকা দিলো হামাস

অনলাইন ডেস্ক:
অক্টোবর ৯, ২০২৩ ৭:৩৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ নামের যে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে হামাস তার পেছনে কাজ করেছে ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণকারী সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীটির দীর্ঘ ও সুচতুর কৌশল ও পরিকল্পনা; যা প্রাথমিকভাবে প্রায় হতবুদ্ধিকর অবস্থায় ফেলেছিল অধিকৃত জেরুজালেমের শাসকগোষ্ঠীকে।

শনিবার ভোর থেকে যে হামলা শুরু করেছে হামাস, তা ১৯৭৩ সালের পর ইসরায়েলের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক। ইসরায়েলেও স্বীকার করেছে, এই সময়ে এত বড় একটি হামলার আশঙ্কা আগে তাদের কল্পনাতেও আসেনি। প্রসঙ্গত, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর একটি।

রয়টার্সকে আইডিএফ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত প্রায় ২ বছর ধরে হামাসের নীরব থাকার কৌশলে তারা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন এবং বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, গাজা ভূখন্ডের নিয়ন্ত্রণকারী এই সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীটি হয়তো যুদ্ধের পথ পরিহার করতে চায়।

কিন্তু শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ তাদের সেই ধারণা ভয়ানকভাবে পাল্টে দিয়েছে। এখন যে কোনো মূল্যে নিজেদের সেই ‘ভুল’ শুধরে নিতে তারা বদ্ধপরিকর।

হামলার প্রথম দিন শনিবার ভোরের দিকে ইসরায়েলের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একের পর এক রকেট ছোড়া শুরু করে হামাস। সেই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে ইসরায়েলের ভেতর প্রবেশ করে নির্বিচারে সামরিক-বেসামরিক লোকজনকে হত্যা করতে থাকে।

হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে অপ্রস্তুত এবং খানিকটা হতবাক হলে গেলেও, দ্রুতই সেই অবস্থা কাটিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়া শুরু করে আইডিএফ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দিনে ইসরায়েল ও গাজা ভূখণ্ডে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১শ’রও বেশি মানুষ এবং আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার। এই হতাহতদের মধ্যে সামরিক-বেসামরিক উভয়ই রয়েছেন।

এর আগে ২০২১ সালের জুনে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক রকেট হামলা চালিয়েছিল হামাস। সেবার অবশ্য ইসরায়েলের খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ৯০ শতাংশেরও বেশি রকেট ঠেকিয়ে দিতে পেরেছিল আইডিএফ।

১০ দিন ধরে বিরতিহীনভাবে হাজার হাজার রকেট ছোড়ার পর একাদশতম দিনে মিশরের হস্তক্ষেপে যুদ্ধ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল হামাস। তারপর প্রায় ২ বছর পর্যন্ত ইসরায়েলের অভ্যন্তরে তো বটেই, এমনকি সীমান্ত অঞ্চলেও কোনো গণ্ডগোল করেনি স্বাধীনতাকামী এই কট্টরপন্থী মুসলিম রাজনৈতিক গোষ্ঠী।

ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের জন্য শনিবার বিশেষ পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই ধর্মের অনুসারীদের কাছে শনিবার দিনটি কেবলমাত্র প্রার্থনার জন্য বরাদ্দ এবং ইসরায়েলে এটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন।

হামাসের গত তিন দিনের হামলায় ইসরায়েলে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৭ শতাধিক ইসরায়েলি ও অন্যান্য দেশের নাগরিক, আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার। আইডিএফের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের পূর্ব প্রস্তুতির অভাব এবং শনিবারের কর্মবিরতির কারণে হতাহতের সংখ্যা এই পরিমাণ বেড়েছে।

ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর নির দিনার এই হামলাকে ২০০১ সালের টুইন টাওয়ারের হামলার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘এখন আমরা নাইন ইলেভেনের মধ্যে রয়েছি। হামাস আমাদের এই অবস্থায় এনে ফেলেছে।’

এর মধ্যেই গাজার সাধারণ লোকজনকে সীমান্ত পেরিয়ে ইসরায়েলে প্রবেশ ও কাজের অনুমতি দেয় দখলকৃত জেরুজালেমের ইহুদি শাসকগোষ্ঠী। এতে দারিদ্রপীড়িত গাজা ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক অবস্থাতেও বদল আসা শুরু করেছিল একটু একটু করে।

কিন্তু হামাসের উচ্চ পর্যায়ের এক নেতা রয়টার্সের কাছে স্বীকার করেছে যে, গত দুই বছরের নীরবতা ছিল আসলে একটি ছল মাত্র।

রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘এট ছিল হামাসের একটি ভান বা কৌশল। আমরা ইসরায়েলকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে, হামাস আর যুদ্ধ চায় না। কিন্তু এই সময়সীমার মধ্যে আমরা আমদের যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, অস্ত্রভাণ্ডার শক্তিশালী করেছি এবং কোথায়-কখন-কীভাবে হামলা শুরু হবে তার পরিকল্পনা করেছি।’

‘তাছাড়া ইসরায়েলকে ধোঁকার মধ্যে রাখতে গত কয়েক মাস ধরে আমরা নিত্যনতুন গোয়েন্দা কৌশল নিচ্ছিলাম, যা এর আগে কখনও নেওয়া হয়নি। এমনকি গাজার সাধারণ লোকজনও আঁচ করতে পারেনি যে আমরা কী করতে যাচ্ছি। কেউই ভাবতে পারেনি আমরা ইসরায়েলকে প্রস্তুত হওয়ার কোনো প্রকার সুযোগ না দিয়ে এত বড় একটি অপারেশন চালাতে যাচ্ছি।’

হামাসের লেবানন শাখার প্রতিনিধি ওসামা হামদান রয়টার্সকে বলেন, ‘হামাসের এই হামলা প্রমাণ করে যে, ইসরায়েল যতই সামরিক ও অন্যান্য সক্ষমতা থাকুক না কেন— ফিলিস্তিনের জনগণ তাদের লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’