Hathazari Sangbad
হাটহাজারীশনিবার , ৬ জানুয়ারি ২০২৪

ভোটের জন্য প্রস্তুত চট্টগ্রাম

অনলাইন ডেস্ক
জানুয়ারি ৬, ২০২৪ ১০:১৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাত পোহালেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। আওয়ামী লীগ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি জোর প্রচারণা, কিছু কিছু এলাকায় সংঘাত-সংঘর্ষসহ নানা কারণে আলোচিত এ নির্বাচনে সুন্দরভাবে ভোটগ্রহণের সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।

রোববার (৭ নভেম্বর) সকাল ৮টা থেকে শুরু হচ্ছে ভোটযুদ্ধ, চলবে বিকেল চারটা পর্যন্ত। এবার চট্টগ্রামের ১৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১২৫ জন প্রার্থী। শুক্রবার (৫ নভেম্বর) সকাল ৮টায় প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। এখন শুধু অপেক্ষা ভোট উৎসবের।

এবারের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত, কিছু বাম দল এবং তাদের সমমনা দলগুলো অংশ নিচ্ছে না। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তার মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পাশাপাশি দল থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার পথ খোলা রাখায় বিপুলসংখ্যক প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদসহ সব মিলিয়ে ২৮টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা এবার ভোটে অংশ নিচ্ছেন।

এদিকে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পাঁচস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সন্দ্বীপে বিজিবির পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে নৌবাহিনী।

চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে এবার মোট ভোটার ৬৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩২ লাখ ৮৯ হাজার ৫৯০ জন, নারী ভোটার ৩০ লাখ ২৪ হাজার ৭৫১ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৫৬ জন।

চট্টগ্রামের সব আসন মিলিয়ে মোট ভোটকেন্দ্র ২০২৩টি এবং ভোট গ্রহণ কক্ষ ১৩ হাজার ৭৩২টি। প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ৪৩ হাজার ২১৯ জন। ১০ শতাংশ অতিরিক্তসহ ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকবেন মোট ৪৭ হাজার ৫৪৪ জন।

চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, ‘আমরা আমাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। নির্বাচনি সরঞ্জাম অনেকগুলোই আগে পাঠানো হয়েছে। আজ (শনিবার) সকাল থেকে বাকিগুলো পাঠানো হচ্ছে। পুলিশ, আনসার বাহিনীর সদস্যদের কেন্দ্রের দায়িত্ব ইতিমধ্যেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যালটপেপার আগামীকাল (রোববার) সকাল ৭টার মধ্যে কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে যাবে। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু হয় সেজন্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও মাঠে কাজ করছে।’

এছাড়া চট্টগ্রাম জেলার ২ হাজার ২৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৪৬৩টিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; শতাংশের হিসেবে যা ৭২ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে জেলায় ১০১৩টি কেন্দ্র এবং নগরীতে ৪৫০টি কেন্দ্র ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এসব কেন্দ্রের নাম ও তালিকা নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে। সে হিসেবে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

নির্বাচনে নগর পুলিশের ৪ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন থাকবে বলে জানা গেছে। আর জেলা পুলিশের মোতায়েন থাকবে ৪ হাজার ৫০০ সদস্য।

এদিকে উত্তপ্ত প্রচারণার পর চট্টগ্রামে ভোট নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। এ পরিস্থিতিতে শনিবার (৬ জানুয়ারি) সকালে নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের ব্রিফিং করার সময় নগর পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘এক ধরণের লোক এ নির্বাচনকে প্রতিহত করার জন্য মানুষের জানমালের উপর আঘাত হানছে। গতকাল (শুক্রবার) একটি যাত্রীবাহি ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়েছে। আমাদের এখানেও গত রাতে বন্দর এলাকার একটি ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়া হয়েছে।’

চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার এস এম শফিউল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে আমাদের ৪ হাজার ৫০০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। তিন স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মোটরসাইকেল চালানোর উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়ছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে বিজিবি, আনসার কোস্ট গার্ড দায়িত্ব পালন করবে। এখন পর্যন্ত বড় কোনো নাশকতা ঘটনা ঘটেনি। উৎসাহ, উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে ভোটকেন্দ্রে মানুষ ভোট দিতে পারবে। তবুও আমরা সতর্ক আছি যে কোনো নাশকতা মোকাবিলায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেসব এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ করে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও পটিয়া আসনে আমরা আলাদাভাবে নজর রেখেছি। সে সঙ্গে আলাদা ফোর্সও রেডি করেছি। কোনো ভোটারকে যদি কেউ বাধা দেয়, আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব। কেউ ভোটকেন্দ্র দখল বা দখলের সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারবে না।’

নির্বাচনে যা যা নিষেধের আওতায়-
শুক্রবার (৫ জানুয়ারি) রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের স্বাক্ষর করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ৫ জানুয়ারি সকাল আটটা থেকে মঙ্গলবার (৯ জানুয়ারি) বিকাল চারটা পর্যন্ত যে কোনও ধরনের সভা, সমাবেশ, মিছিল ও শোভাযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।

নির্বাচনি এলাকাগুলোতে কোনও ব্যক্তি জনসভা বা অনুষ্ঠান আহ্বান কিংবা তাতে যোগদান করতে এবং কোনও ব্যক্তি মিছিল বা শোভাযাত্রা সংগঠিত করতে বা তাতে যোগদান করতে পারবেন না। এই বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় এলাকায় শনিবার (৬ জানুয়ারি) মধ্যরাত ১২টা থেকে ৭ জানুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস, ট্রাক ইত্যাদি চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ৫ জানুয়ারি রাত ১২টা থেকে সোমবার (৮ জানুয়ারি) রাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন ও অনুমতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক; জরুরি সেবা কাজে নিয়োজিত যানবাহন এবং ওষুধ, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ও এ ধরনের কাজে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি, সংবাদপত্র বহনকারী সব ধরনের যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকবে।

এছাড়া আত্মীয়-স্বজনের জন্য বিমানবন্দরে যাওয়া, বিমানবন্দর থেকে যাত্রী বা আত্মীয়-স্বজনসহ নিজ বাসস্থানে অথবা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত যানবাহন (টিকিট বা অনুরূপ প্রমাণ প্রদর্শনপূর্বক) এবং দূরপাল্লার যাত্রী বহনকারী অথবা দূরপাল্লার যাত্রী হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে যাতায়াতের জন্য যেকোনও যানবাহন চলাচলেও ছাড় দেওয়া হবে।

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর জন্য একটি, প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর নির্বাচনি এজেন্টের (যথাযথ নিয়োগপত্র বা পরিচয়পত্র থাকা সাপেক্ষে) জন্য একটি গাড়ি (জিপ, কার, মাইক্রোবাস ইত্যাদি ছোট আকৃতির যানবাহন), রিটার্নিং অফিসারের অনুমোদন ও গাড়িতে স্টিকার প্রদর্শন সাপেক্ষে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে।

সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক অথবা জরুরি কোনও কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমোদন সাপেক্ষে চলাচলের অনুমতি পাবে। নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্বাচনি কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী অথবা অন্য কোনো ব্যক্তির জন্য মোটরসাইকেল চলাচলের অনুমতি পাবে।

প্রতিবন্ধী ভোটারদের সহযোগিতায় নিয়োজিত যানবাহন; মহানগর থেকে বের হওয়া বা প্রবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মহাসড়ক ও প্রধান প্রধান রাস্তার সংযোগ বা এমন সব রাস্তায় নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকবে।

এতে আরও বলা হয়, ৬ জানুয়ারি রাত ১২টা থেকে ৭ জানুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলার নির্বাচনি এলাকায় সকল প্রকার নৌ-যান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

শুধুমাত্র রিটার্নিং অফিসারের অনুমতি সাপেক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাদের নির্বাচনি এজেন্ট, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের (পরিচয়পত্র থাকতে হবে), নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত দেশি-বিদেশি সাংবাদিক (পরিচয়পত্র থাকতে হবে), নির্বাচনি কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, নির্বাচনের বৈধ পরিদর্শক এবং কতিপয় জরুরি কাজ যেমন অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ডাক, টেলিযোগাযোগ ইত্যাদি কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য উল্লিখিত নৌ-যান, ভোটার ও জনসাধারণের চলাচলের ক্ষেত্রে ও দূর পাল্লার নৌ-যান চলাচলের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকবে।

নির্বাচনে যত সংঘাত-
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চট্টগ্রাম নগরীর আসনগুলোতে তেমন সংঘাত না হলেও জেলার পটিয়া, বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও ক্যাম্প ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতীক বরাদ্দের পরপরই গত ১৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম-১৬ বাঁশখালী আসনে দুই প্রার্থীর সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়ায়। উপজেলা সদরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান স্বতন্ত্র প্রার্থী দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুজিবুর রহমানের সমর্থকেরা। এ ঘটনায় থানায় দুই পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি পৃথক দু’টি মামলা করা হয়।

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য নৌকা প্রতীকের আবু রেজা মো. নেজামুদ্দিন নদভী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ঈগল প্রতীকের সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল মোতালেবের সমর্থকদের মধ্যে কয়েকবার হামলা, ভাঙচুর ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয়েছেন অনেকেই। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি তিনটি মামলাও হয়েছে।

এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনও সংঘাতে পিছিয়ে ছিল না। প্রতীক বরাদ্দের পর স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরী (ঈগল) এবং আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মোতাহের হোসেন চৌধুরীর সমর্থকদের সঙ্গে কয়েক দফা মারামারি ও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ভাঙচুর করা হয়েছে অন্তত ১২টি গাড়ি। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন। স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভাই ও বোনকেও মারধর করা হয়েছে। সন্দ্বীপেও দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হয়।