Hathazari Sangbad
হাটহাজারীমঙ্গলবার , ২৮ মে ২০২৪

নিজের বুক পেতে উপকূলকে এবারও রক্ষা করল সুন্দরবন

অনলাইন ডেস্ক
মে ২৮, ২০২৪ ৭:২৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট আরও একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে বাংলাদেশে। রিমাল নামের ঘূর্ণিঝড়টি গত রবিবার রাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ ও বাংলাদেশের পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে আঘাত হানে স্থলভাগে। প্রাণহানি তুলনামূলক কম হলেও ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট আর ফল-ফসলের ক্ষতি করেছে অপরিমেয়। গতকাল সোমবার পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৫ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে আর আংশিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ঘরবাড়ি। ভেসে গেছে হাজার হাজার হেক্টর মাছের ঘের ও ফসলি জমি। তবে এই ক্ষতি আরও বেশি হতে পারত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, সিডর বা আইলার মতো প্রলয়ংকরী ঝড়ের সময় সুন্দরবন যেভাবে উপকূলকে আরও বেশির ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেছিল, এবারও একইভাবে রিমালের হাত থেকে বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছে সুন্দরবন।

বাংলাদেশ অংশে ছয় হাজারের বেশি বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাদাবন মমতাময়ী মায়ের মতোই আগলে রেখেছে উপকূলের কয়েকটি জেলার জনপদকে। সুন্দরবনের গাছপালায় আচ্ছাদিত বিশাল প্রাচীরের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা কম টের পেয়েছেন বঙ্গোপসাগর উপকূলের জনপদের মানুষ। রিমাল উপকূলে আঘাত হানার সময় জলোচ্ছ্বাসের পানির উঁচু চাপও ঠেকিয়েছে সুন্দরবন। তবে রিমাল আঘাত হানার সময় এবং গতকাল সোমবার দুপুরে ৫ থেকে ৭ ফুট উঁচু জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে গোটা সুন্দরবন। এতে নোনাপানিতে তলিয়ে গেছে বনের মাঝে থাকা মিষ্টি পানির পুকুরগুলো। অনেক বন্যপ্রাণী ভেসে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সুন্দরবনের কারণে এবারও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়েছে বলে মনে করেন খুলনা আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের যে বাতাসের বেগ, সেটি ছিল ৯০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। এই গতিবেগের একটি ঘূর্ণিঝড় যখন ভূমিতে আঘাত হানে, তখন এটি ১২০ বা ১৩০ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এটি যখন উপকূলে আঘাত হেনেছে, তখন উপকূল এলাকায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাতাসের বেগ ছিল।

তিনি বলেন, ঝড়গুলো যে বেগে আসে, সেই তুলনায় ভূমিতে কম বেগে প্রবেশ করে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, এটা অতিক্রম করে সুন্দরবনের পাশ দিয়ে। সুন্দরবন এলাকায় এটা যখন প্রথমে ওঠে, তখন দেখা যায় সর্বোচ্চ যে বাতাসের গতি থাকে, সেখানে সুন্দরবনের পাশে আঘাত হানাতে সে গতিটা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। পরে সামনে আগালেও সে গতিটা থাকে না। তবে যে সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশকে বারবার রক্ষা করে, সেই সুন্দরবনও এবার ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে বনের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেছে সুন্দরবন। এতে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, জোয়ারের প্রভাবে সুন্দরবনের মিঠাপানির পুকুরগুলোও সাগরের নোনাপানিতে তলিয়ে গেছে। যেখান থেকে বনের প্রাণী ও বনজীবীরা খাবার পানি সংগ্রহ করে থাকেন।

বন্যপ্রাণীর জন্য বড় ক্ষতির আশঙ্কা করে বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বনসংরক্ষক মিহির কুমার দে  বলেন, ‘রিমালের প্রভাব এখন সুন্দরবনে রয়ে গেছে। প্রচুর বাতাস এবং বৃষ্টিপাত হচ্ছে । পুরো বন এখন প্লাবিত। বনাঞ্চল ৮ থেকে ১০ ফুট পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া সুন্দরবনে মিষ্টি পানির পুকুরও নোনা জলে তলিয়ে গেছে। যেসব পানি বনজীবী মানুষ এবং বনকর্মীরা ব্যবহার করতেন, সবই এখন পানির নিচে। তাই আমরা বন্যপ্রাণীর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘গাছপালারও অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আবার কিছু অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, এটা আমরা বলতে পারিছ না। যেহেতু আমরা কেউ বের হতে পারছি না। নদী উত্তাল। দুর্যোগ চলে যাওয়ার পর প্রাণিকুলসহ অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত বলতে পারব।’

আবহাওয়া, জলবায়ু ও সমুদ্রবিজ্ঞানী ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, বাংলাদেশে ঝড় প্রবেশের মুখেই সুন্দরবনের অবস্থান। এর কারণে ঝড় প্রবেশ করতেই বনে বাধার সম্মুখীন হয়। এতে বনের গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হলেও লোকালয়কে দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে যেসব ঝড় দেখেছি, এর মধ্যে একটি হলো সিডর। ওই ঝড়টির কারণে সুন্দরবন বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যদি সুন্দরবন না থাকত, তবে এ ক্ষতির পরিমাণ কল্পনারও বাইরে থাকত।

তার ভাষ্য, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা মারাত্মক বিধ্বংসী ক্ষমতা নিয়ে আছড়ে পড়লেও সুন্দরবনে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফলে অনেক কম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। প্রাণহানিও হয়েছিল আশঙ্কার চেয়ে অনেক কম। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূল ও তৎসংলগ্ন এলাকার মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষায় দেয়ালের মতো কাজ করে সুন্দরবন।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু সম্প্রতি সময়ে লক্ষ করলে দেখা যাবে, গত দুই দশকে সুন্দরবনকে যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি করেছি। নদী দখল করা হয়েছে। সুন্দরবনের আশপাশে নানা ধরনের ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা হচ্ছে। এখন আমরা সিডর, আইলা, আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড়ের কারণে যে ক্ষতি সুন্দরবনের হয়েছে সে ক্ষতি কিন্তু আমরা এখন কাটিয়ে উঠতে পারিনি। সুন্দরবন যেমন আমাদের রক্ষা করে তেমনি সুন্দরবনকে রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব এই জায়গায় আমাদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।’

বাপার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় এলে সুন্দরবনের জন্য ভালোবাসা বাড়ে। কিন্তু যখন সব স্বাভাবিক হয়, তখনই আমরা সব ভুলতে শুরু করি। অথচ সুন্দরবনের চারপাশ ঘিরে সুন্দরবনকে হত্যা করার যত আয়োজন সব করছি। উজান থেকে মিঠাপানি আশা বন্ধ হয়ে গেছে। আগের মতো মিঠাপানি আসে না। ফলে সুন্দরী গাছ হারিয়ে গেছে। সুন্দরবনের ভেতরে বিষ দিয়ে মাছ ধরার ফলে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র হারিয়ে গেছে। সুন্দরবনের চারপাশে প্রচণ্ড দূষক উৎপাদনকারী কলকারখানা গড়ে তোলা হয়েছে । শুধু তাই নয় সুন্দরবনে জাহাজভাঙা শিল্প আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে সার, কয়লার জাহাজ চলাচল করে। এগুলো ডুবে দূষণ ছড়াচ্ছে। জাতিসংঘ পর্যন্ত বলেছে, এসব যেন সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচল না করে। এখন আমরা তো কোনো কিছুই শুনছি না।’

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন সুন্দরবন আমরা গাছা লাগায়া পয়দা করি নাই। অথচ এই সরকারের আমলে সুন্দরবনকে সবচেয়ে ইন্ডাস্ট্রি করার জন্য সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করা হয়েছে। এগুলোকে বৈধতা দেওয়ার জন্য কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা যেটা করা হলো সেখানেও বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করা হয়েছে। মানুষের মতামতকে স্থান দেওয়া হলো না। কাজেই সরকার নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছে। সুন্দরবন যদি না টিকে আমরা টিকে থাকতে পারব না।